আগামী ৩১ অক্টোবর ২০২১ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ এর ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী




মোঃমোশারফ হোসেন রুবেল 

ক্রাইম রিপোর্টার

দৈনিক বঙ্গ দর্পন

১৯৭২ সালের এই দিনে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে ৯নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল অব: এবং ছাত্রলীগের এককালীন সাধারণ সম্পাদক, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ডাকসুর প্রথম ভিপি, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শীর্ষ নেতা, মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ-মুজিব বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের উপ-অধিনায়ক আ স ম আব্দুর রব যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৭ (সাত) সদস্যের কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। একই বছর ২২ ডিসেম্বর প্রথম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে মেজর এম এ জলিল অব: সভাপতি এবং আ স ম আব্দুর রবকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। ষাট দশকে তৎকালীন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে যে নেতা-সংগঠক-কর্মীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে আপসহীন র‌্যাডিকাল ভূমিকা পালন করেছেন সেই বিপ্লবী ধারার যুব নেতৃত্বই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করে জাসদ গঠন করেন। ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে জাসদ পরিচালিত গণআন্দোলন গণসমর্থন লাভ করে। দেশের ছাত্র-তরুণ-যুব সমাজ জাসদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ১৯৭৩ সালে জাসদ ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে জাসদ তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দ্বারা বাঁধার সম্মুখীন হয়। মেজর জলিল, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদসহ কয়েকজন প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার পরও পরবর্তীতে পরাজিত দেখানো হয়। উল্লেখ্য, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদের বিজয় কেড়ে নিয়ে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। টাঙ্গাইল থেকে জাসদ প্রার্থী আব্দুস সাত্তার বিজয়ী হন। স্বতন্ত্র বিজয়ী প্রার্থী আব্দুল্লাহ সরকার জাসদে যোগদান করেন। জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামরুজ্জামান রাজশাহীর ২টি আসনে বিজয়ী হয়ে একটি আসন ছেড়ে দিলে, রাজশাহীর সেই আসনের উপ-নির্বাচনে জাসদ প্রার্থী মাইনউদ্দিন আহমেদ মানিক বিজয়ী হন। তিনটি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে জাসদ সোচ্চার বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের পাশাপাশি দেশব্যাপী গণআন্দোলন গড়ে তোলে। জাসদের উপর ক্ষমতাসীন সরকার ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাপক দমন-পীড়ন-নির্যাতন নেমে আসে। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদের স্মারকলিপি প্রদানের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে রক্ষীবাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ-হত্যাযজ্ঞ এবং সভাপতি মেজর এম এ জলিল অব:, সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রবসহ একযোগে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সকল নেতা এবং জেলা ও থানা পর্যায়ের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রধান নেতৃবৃন্দসহ জাসদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। সংসদীয় রাজনৈতিক দল হিসাবে জাসদের বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়।

১৯৭৪ সালে দেশে জরুরী অবস্থা জারি হলে জাসদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আরো বেড়ে যায়। হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেল-জুলুম হত্যার শিকার হন। জেলের বাইরে থাকা জাসদ কর্মীদের অবস্থা ছিল বাঘের হিংস্র আক্রমণের মুখে হরিণের আত্মরক্ষা করার মত অবস্থা। এরকম পরিস্থিতিতে জেলের বাইরে থাকা জাসদের নেতা-কর্মীরা আত্মরক্ষা এবং বিপ্লবী সংগ্রাম এগিয়ে নিতে গণবাহিনী গঠন করে।

 

১৯৭৫ এর ২৫ জানুয়ারি বাকশাল গঠন করা হলে জাসদ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। জাসদসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ হবার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শুন্যতার সুযোগ নিয়ে খোদ বাকশালের অভ্যন্তরেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু হয়। চরম দমন-নির্যাতনের মধ্যেও জাসদ ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পথে পা না বাড়িয়ে, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারীদের সাথে হাত না মিলিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান অব্যাহত রাখে।

 

খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে। এ হতবিহ্বল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যখন স্বাধীনতার স্বপক্ষের সকল রাজনৈতিক দল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে, তখন জাসদ কোনো ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে না থেকে তাৎক্ষনিকভাবে খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়ায়। খন্দকার মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনেও জাসদের নেতা-কর্মীদের উপর খুন-গুম-জেল-জুলুম অব্যাহত রাখে। জলিল-রবসহ কারাবন্দী জাসদের নেতা-কর্মীদের কারাগারেই বন্দী রাখা হয়।

 

খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখল এবং মোশতাক অনুসারী সেনা অফিসারদের উশৃংখলতা সেনাবাহিনীর মধ্যে চরম বিশৃংখল অবস্থা তৈরি করে, উচ্চাভিলাষী সামরিক অফিসাররা ক্ষমতার লোভে সেনাবাহিনীকে বিভক্ত করে ফেলে, উচ্চাভিলাষী অফিসাররা ক্ষমতার খেলায় গুলি-গোলার মুখে সিপাহীদের ঠেলে দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর উচ্চাভিলাষী অফিসার খালেদ মোশাররফ কর্তৃক সেনাপ্রধান জিয়ার অপসারণ ও বন্দী করে নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করে। বঙ্গবন্ধুর খুনী কর্নেল রশিদ-কর্নেল ফারুক চক্র জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে নিরাপদে দেশত্যাগ করার সুযোগ করে দেয়। অফিসারদের বিশৃংখলায় এরকম জাতীয় সংকটময় ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অবৈধ ক্ষমতা দখলদারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত এবং সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে সাধারণ সিপাহীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেয়। এ পরিস্থিতিতে সেনা ছাউনিতে রক্তারক্তির ঘটনা এড়ানো, সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনা এবং অনিশ্চয়তা থেকে দেশকে রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বিদ্রোহী সিপাহীদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করতে উদ্যোগী ও সাহসী ভূমিকা নেয়। ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী জনতার অভ্যূত্থান সংগঠিত হয়।  


বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে জিয়া সিপাহীদের ১২ দফা দাবির সাথে বেঈমানী করে। কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা সজানো মামলায় গ্রেফতার করে। সামরিক আদালতে প্রহসনমূলক বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা, জলিল-রব-ইনুসহ জাসদ নেতৃবৃন্দকে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদী কারাদন্ডে দন্ডিত করে।

Comments

Popular posts from this blog

"সমাজ বদলায় না, বদলায় সমাজের মুখোশ।"

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরো একটি নতুন রাজনৈতিক দল এর আত্মপ্রকাশ।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সেনাবাহিনীর অবস্থান প্রসঙ্গে "জাতীয় প্রগতিশীল পার্টি"র(NPP) বিবৃতি